দুর্নীতি ও অর্থ পাচারের মামলায় অভিযুক্ত বাংলাদেশ পুলিশের সাবেক মহাপরিদর্শক (আইজিপি) বেনজীর আহমেদকে সংযুক্ত আরব আমিরাতের দুবাইয়ে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
আজ রোববার জাতীয় সংসদে ৩০০ বিধিতে দেওয়া এক বিবৃতিতে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ এই তথ্য আনুষ্ঠানিকভাবে নিশ্চিত করেছেন।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সংসদকে জানান, ১২ জুন সংযুক্ত আরব আমিরাত সরকারের পক্ষ থেকে একটি ই-মেইলের মাধ্যমে বাংলাদেশ সরকারকে জানানো হয়েছে, দুর্নীতির মামলায় বেনজীর আহমেদকে আটক করা হয়েছে। তাঁকে অতিদ্রুত বাংলাদেশে ফিরিয়ে আনা হবে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর বরাতে জানা গেছে, বাংলাদেশ সরকারের পক্ষ থেকে ইন্টারপোলের কাছে পাঠানো আবেদনের ভিত্তিতে বেনজীর আহমেদের বিরুদ্ধে রেড নোটিশ জারি করা হয়েছিল। এই নোটিশের কার্যকারিতা বজায় রেখেই দুবাইয়ের নিরাপত্তা সংস্থাগুলো তাঁর অবস্থান শনাক্ত করে এবং স্থানীয় সময় অনুযায়ী গতকাল রাতে তাঁকে আটক বা গ্রেপ্তার করা হয়।
তবে এ বিষয়ে দুবাই পুলিশের পক্ষ থেকে এখনো কোনো আনুষ্ঠানিক বিবৃতি দেওয়া হয়নি।
কী অভিযোগ রয়েছে বেনজীরের বিরুদ্ধে
সাবেক আইজিপি বেনজীর আহমেদের বিরুদ্ধে ক্ষমতার অপব্যবহার, শত শত কোটি টাকার অবৈধ সম্পদ অর্জন এবং মানি লন্ডারিংয়ের (অর্থ পাচার) গুরুতর অভিযোগ রয়েছে।
দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) মামলা: ২০২৪ সালের ১৫ ডিসেম্বর দুদকের পক্ষ থেকে অবৈধ সম্পদ অর্জন ও তথ্য গোপনের অভিযোগে বেনজীর ও তাঁর পরিবারের সদস্যদের বিরুদ্ধে মামলা করা হয়।
অভিযোগপত্র বা চার্জশিট: দীর্ঘ অনুসন্ধান শেষে ২০২৫ সালের ৩০ নভেম্বর আদালতে তাঁর বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র দাখিল করে দুদক। তদন্ত প্রতিবেদন অনুযায়ী, বেনজীর তাঁর দাখিল করা সম্পদ বিবরণীতে কয়েক কোটি টাকার সম্পদ গোপন করেছেন এবং তাঁর নামে অন্তত ১১ কোটি ৪ লাখ টাকার অবৈধ সম্পদ পাওয়া গেছে।
আদালতের পরোয়ানা: অভিযোগপত্র গ্রহণের পর চলতি বছরের মার্চ মাসে ঢাকার একটি বিশেষ আদালত তাঁর বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করেন। এরপর মে মাসে তাঁর অনুপস্থিতিতেই আদালতে অভিযোগ গঠন করা হয়।
মার্কিন নিষেধাজ্ঞা ও পলাতক জীবন
বেনজীর আহমেদ ২০২০ সালের এপ্রিল থেকে ২০২২ সালের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত বাংলাদেশ পুলিশের আইজিপি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। এর আগে তিনি র্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়নের (র্যাব) মহাপরিচালক এবং ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের (ডিএমপি) কমিশনার হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছিলেন।
যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞা: ২০২১ সালের ডিসেম্বরে গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগে যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দপ্তর ও ট্রেজারি বিভাগ র্যাবের সাবেক ও বর্তমান সাত কর্মকর্তার ওপর নিষেধাজ্ঞা দেয়, যার মধ্যে বেনজীর আহমেদের নামও ছিল।
গত ২০২৪ সালের মাঝামাঝি সময়ে তাঁর বিশাল অবৈধ সম্পদের খতিয়ান গণমাধ্যমে আসার পর থেকেই তিনি সপরিবার আত্মগোপনে চলে যান। ধারণা করা হচ্ছিল, তিনি বাংলাদেশ ছেড়ে মধ্যপ্রাচ্য বা ইউরোপের কোনো দেশে আশ্রয় নিয়েছিলেন। পরে তাঁর সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত এবং ব্যাংক হিসাব অবরুদ্ধ করার নির্দেশ দেন আদালত।
বাংলাদেশে ফিরিয়ে আনার প্রক্রিয়া কেমন হবে
বাংলাদেশ ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের মধ্যে কোনো সরাসরি বন্দী প্রত্যর্পণ চুক্তি আছে কি না, তা নিয়ে কূটনৈতিক মহলে আলোচনা চলছে। তবে আইন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, চুক্তি না থাকলেও ইন্টারপোলের মাধ্যমে এবং দ্বিপক্ষীয় কূটনৈতিক তৎপরতা চালিয়ে কোনো আসামিকে ফিরিয়ে আনা সম্ভব।
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের একটি সূত্র জানিয়েছে, বেনজীর আহমেদকে দ্রুত দেশে ফিরিয়ে এনে আদালতে সোপর্দ করার জন্য পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এবং পুলিশ সদর দপ্তর যৌথভাবে কাজ শুরু করেছে। দুবাইয়ে বাংলাদেশের কনস্যুলেট এ বিষয়ে আমিরাত সরকারের সঙ্গে সার্বক্ষণিক যোগাযোগ রক্ষা করছে।
