ছবি: সংগৃহীত
গাজায় ইসরায়েলের গণহত্যামূলক আগ্রাসন চতুর্থ বছরে গড়িয়েছে। নামমাত্র যুদ্ধবিরতি কার্যকর থাকলেও ফিলিস্তিনিদের দৈনন্দিন জীবন এখন স্রেফ খাবার, পানি খোঁজা এবং প্রতিনিয়ত স্বজন হারানো ও বাস্তুচ্যুতির সঙ্গে মানিয়ে নেওয়ার সংগ্রামে পরিণত হয়েছে।
দুই বছর আগে, ইসরায়েলি এক চেকপয়েন্টে নিখোঁজ হন রজা আল-শাওয়িশের স্বামী। দুই বছর এসে তিনি বলছেন, তিনি আর নিজেকে নারী বলে মনে করেন না। স্বামী নিখোঁজ হওয়ার পর সকাল থেকে ঘুমোতে যাওয়ার আগ পর্যন্ত সন্তানদের একা মানুষ করার সব দায়িত্ব তাঁকে একা বইতে হচ্ছে। যে দৈনন্দিন জীবন একসময় তাঁকে নিজস্ব সত্তার অনুভূতি দিত, তা এখন টিকে থাকার প্রতিদিনের লড়াইয়ে ঢাকা পড়েছে। এর ফলে তাঁর আগের জীবন বা আগের নারী সত্তার আর কোনো অস্তিত্ব অবশিষ্ট নেই।
পশ্চিম গাজা সিটিতে ইউএনআরডব্লিউএ–এর একটি স্কুলের কামরায় দুই বছর ধরে আশ্রয় নিয়ে থাকা রজা মিডল ইস্ট আইকে বলেন, ‘গণহত্যার প্রথম বছর স্বামী আমার সঙ্গেই ছিল। পরিস্থিতি কঠিন হলেও সে কষ্টের ভাগ নিত এবং আঘাতগুলো কম বেদনাদায়ক মনে হতো।’ তিনি আরও বলেন, ‘আমার স্বামী নিখোঁজ হওয়ার পর এবং চরম অনাহারের সময় সন্তানদের খাওয়ানোর জন্য আমি এক টুকরো ছাড়া বাকি সব সোনা বিক্রি করেছি। শেষ টুকরোটি বাঁচিয়ে রেখেছি তাঁর ফেরার দিনের জন্য। সে ফিরলে সেটি বিক্রি করে আনন্দ উদযাপনে খরচ করব।’
২০২৪ সালের ২১ অক্টোবর উত্তর গাজায় ইসরায়েলি বাহিনী তাদের পাড়ায় হামলা চালিয়ে দক্ষিণে যেতে বাধ্য করার সময় রজার ৪৮ বছর বয়সী স্বামী মুহাম্মদ নিখোঁজ হন। এক প্রত্যক্ষদর্শীর মতে, ইসরায়েলি বাহিনী মুহাম্মদকে মানবঢাল হিসেবে ব্যবহার করে তাদের সামনে হাঁটার নির্দেশ দিয়েছিল। তিনি তা প্রত্যাখ্যান করলে সেনারা তাঁকে নির্মমভাবে প্রহার করে। ওই প্রত্যক্ষদর্শী জানান, এরপর তাঁর আর কোনো খবর তিনি পাননি।
রজা বলেন, ‘আমি রেড ক্রস এবং ইসরায়েলভিত্তিক মানবাধিকার সংস্থা ‘হা মোকেদ’-এর সঙ্গে যোগাযোগ করেছিলাম। তবে তারা জানায়, ইসরায়েলি কর্তৃপক্ষ মুহাম্মদকে আটকে রাখার কথা স্বীকার করছে না।’ তিনি আরও বলেন, ‘সে দুই বছর ধরে নিখোঁজ, কিন্তু আমার বিশ্বাস সে এখনো বেঁচে আছে। অনেকে এসে বলে, “ধরে নাও সে হয়তো মারা গেছে। ” আমি বলি, না। সে মারা গেছে—এমনটা আমি কল্পনাও করতে পারি না। আমার মনের গভীর থেকে বিশ্বাস, সে কেবল বন্দি অবস্থায় আছে।’
গাজায় ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর ইসরায়েল এই জেনোসাইড বা গণহত্যা শুরু করার পর ১ হাজার ৯৭ দিনে (প্রায় ১ হাজার ১০০ দিন) ৭৪ হাজারের বেশি ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন। তাঁদের মধ্যে ২১ হাজার ৫০০ জনের বেশি শিশু রয়েছে, যার মধ্যে ১ হাজার ২৯ জনের বয়স এক বছরের কম। ১১ হাজার ২০০ জনের বেশি ফিলিস্তিনি নিখোঁজ বা অনাবিষ্কৃত থাকায় এই মৃত্যুর প্রকৃত সংখ্যা নির্ধারণ করা কঠিন হয়ে পড়েছে।
এরপর, ২০২৫ সালের ১০ অক্টোবর একটি যুদ্ধবিরতি স্বাক্ষরিত হওয়া সত্ত্বেও এই হত্যাকাণ্ড অব্যাহত রয়েছে। এরপর থেকে ইসরায়েল সাংবাদিক, চিকিৎসক, উদ্ধারকর্মী, লেখক, শিল্পী ও ফুটবলারসহ অন্তত ১ হাজার ৪০০ ফিলিস্তিনিকে হত্যা এবং ৪ হাজার ১৩১ জনকে আহত করেছে।
এই চরম ধ্বংসযজ্ঞ বিশ্বজুড়ে তীব্র নিন্দার ঝড় তুলেছে। এটি গাজায় ইসরায়েলের হামলা এবং পশ্চিম তীর ও পূর্ব জেরুজালেমে দখলাভিযানের বিরুদ্ধে আইনি পদক্ষেপ গ্রহণকে ত্বরান্বিত করেছে। আন্তর্জাতিক বিচার আদালতে (আইসিজে) দক্ষিণ আফ্রিকার দায়ের করা মামলায় ইসরায়েল জেনোসাইড কনভেনশন লঙ্ঘনের অভিযোগের মুখোমুখি হয়েছে। আদালত দেখেছে যে, গাজার ফিলিস্তিনিদের গণহত্যা থেকে সুরক্ষিত থাকার স্পষ্ট অধিকার রয়েছে।
পৃথক আইনি প্রক্রিয়ায় ফিলিস্তিনি ভূখণ্ডে ইসরায়েলি দখলাভিযানের বৈধতার বিষয়টিও খতিয়ে দেখা হয়েছে। আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতে (আইসিসি) প্রসিকিউটররা মানবতাবিরোধী অপরাধ ও যুদ্ধাপরাধের অভিযোগে ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু এবং তাঁর সাবেক প্রতিরক্ষা মন্ত্রী ইয়োভ গ্যালান্তের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করেছেন।
ইসরায়েলি সরকার এসব অভিযোগ বারবার প্রত্যাখ্যান করেছে। তারা আবাসিক ভবন, স্কুল, হাসপাতাল ও বেসামরিক স্থাপনায় হামলার সপক্ষে দাবি করেছে যে, হামাস বা অন্যান্য ফিলিস্তিনি সশস্ত্র গোষ্ঠী সেখান থেকে কার্যক্রম পরিচালনা করে।
টিকে থাকাই এখন সার্বক্ষণিক কাজ
বেশিরভাগ ফিলিস্তিনির দিন শুরু হয় আরও জরুরি কিছু প্রশ্ন নিয়ে—পানি কোথায় পাব, কী খাব এবং আগামী কয়েক ঘণ্টা কীভাবে পার করব। ভোর হতেই নিহাদ আল-স্কাফি পানির লাইনে গিয়ে দাঁড়ান। ৩৬ বছর বয়সী পাঁচ সন্তানের এই জনক তাঁর পরিবারকে সারাদিন টিকিয়ে রাখার রসদ জোগাড় করতে সকালের পুরোটা সময় পার করেন।
পশ্চিম গাজার এক বাস্তুচ্যুত ক্যাম্পে মাটির মধ্য থেকে বেরিয়ে থাকা একটি পাইপ থেকে পানির পাত্র ভরতে ভরতে স্কাফি মিডল ইস্ট আইকে বলেন, ‘ঘুম থেকে ওঠা থেকে শুরু করে ঘুমাতে যাওয়া পর্যন্ত আমাদের পুরোটা সময় কাটে মৌলিক চাহিদা মেটানোর কাজে: পানি জোগাড় করা, খাবার খোঁজা, খাওয়া, বেঁচে থাকা, তারপর ঘুমানো। এখন যে পানি সংগ্রহ করছি তা কেবল ধোয়ামোছা ও গোসলের জন্য, এটি অত্যন্ত লোনা। খাওয়ার পানির জন্য আমাদের একদিন পর পর পানির ট্যাঙ্কারের জন্য অপেক্ষা করতে হয়। আমরা খুব ভোরে উঠে দীর্ঘ লাইনে দাঁড়াই।’
গণহত্যার আগে সুজাইয়ার মূল বাসিন্দা স্কাফি নির্মাণশ্রমিক হিসেবে কাজ করতেন। আজ তিনি পরিবারকে খাওয়াতে ত্রাণ সংস্থাসমূহের খাদ্য সহায়তার আশায় লাইনে অপেক্ষা করেন। দুপুরের মধ্যে প্রশ্ন দাঁড়ায়, দুপুরের খাবারের কী ব্যবস্থা হবে। তিনি আরও বলেন, ‘খাবার পেলে আমাদের দুপুরে খাওয়ার কিছু থাকে। কিন্তু রান্না করা খাবার না পেলে আমাদের চিন্তা করতে হয় কী খাব এবং কীভাবে তা জোগাড় করব। তারপর শুধু রান্নার জন্য খড়ি খোঁজা এবং আগুন জ্বালানোর সংগ্রাম শুরু হয়। প্রতিটি পদক্ষেপই এক একটি সংগ্রাম। আমাদের রান্নার গ্যাসের সিলিন্ডার শেষ হয়ে গেছে। এখন আবার গ্যাস ভরতে আমাদের প্রায় ৪০ দিন অপেক্ষা করতে হবে। ততদিন খড়ি ব্যবহার করা ছাড়া কোনো উপায় নেই।’
২০২৫ সালের অক্টোবরের যুদ্ধবিরতির আওতায় জ্বালানি ও রান্নার গ্যাস প্রবেশের অনুমতি দেওয়ার চুক্তি হলেও গাজায় গ্যাসের তীব্র সংকট বহাল রয়েছে। এর ফলে চাহিদার তুলনায় সরবরাহ অনেক কম থাকায় পরিবারগুলোকে তাদের পালা আসার জন্য সপ্তাহ বা মাস ধরে অপেক্ষা করতে হচ্ছে। গাজা জেনারেল পেট্রোলিয়াম অথরিটি নতুন চালানের আগমন অনুযায়ী সুবিধাভোগীদের তালিকা প্রকাশ করে এবং সেই তালিকা অনুযায়ী প্রাপ্ত গ্যাস বণ্টন করে।
সংকট থেকে জীবিকা নির্বাহ
বিকেলের মধ্যেই সবার জন্য অন্য একটি মৌলিক কাজ মুখ্য হয়ে ওঠে—মোবাইল ফোন চার্জ করার জন্য বিদ্যুৎ খোঁজা। গণহত্যার সময় গাজার বিদ্যুৎ অবকাঠামো প্রায় পুরোটাই ধ্বংস হয়ে যাওয়ায় বেশিরভাগ ফিলিস্তিনিরই নিয়মিত বিদ্যুৎ সুবিধা নেই।
অনেকে বেসরকারি জেনারেটর বা সোলার প্যানেলের ওপর নির্ভর করেন। আর যাদের এগুলো নেই, তারা ছোট চার্জিং পয়েন্টে টাকা দিয়ে ফোন চার্জ দেন। বেসরকারি জেনারেটরের বিদ্যুতের খরচ এখন প্রতি কিলোওয়াট-ঘণ্টায় প্রায় ৩০ থেকে ৩৫ শেকেল (১০-১১ ডলার)।
৩৪ বছর বয়সী হিলাল আল-জুওয়াইদির জন্য এটি এখন আয়ের উৎসে পরিণত হয়েছে, যা তিনি কখনো কল্পনাও করেননি। যুদ্ধের আগে তিনি নির্মাণ কাজ করতেন এবং ফলমূলের ব্যবসা করতেন। আজ তিনি বাস্তুচ্যুত ও স্থানীয় অধিবাসীদের মোবাইল ফোন চার্জ দিয়ে সামান্য আয় করছেন। তিনি বলেন, ‘এটি সম্পূর্ণ নতুন এক ধরণের কাজ যা যুদ্ধের আগে আমরা জানতাম না। বাস্তুচ্যুত এবং আশেপাশে বসবাসকারী মানুষ প্রতিদিন তাদের ফোন চার্জ দিতে নিয়ে আসে। তারা নিজের চার্জার আনলে আমি প্রতি ফোন চার্জে এক শেকেল এবং চার্জার না আনলে দুই শেকেল নিই।’
তবে জুওয়াইদি আফসোস করে জানান, বারবার বিদ্যুৎ বিভ্রাটের কারণে প্রায়ই তাঁর জেনারেটর বন্ধ হয়ে যায় এবং তিনি ‘বিদ্যুতের খরচ মেটাতে হিমশিম খান।’ তিনি বলেন, ‘আজ চারজনের একটি পরিবারকে কেবল ফোন চার্জ দিতেই মাসে প্রায় ১২০ শেকেলের মতো খরচ করতে হয়। সবাই তা বহন করতে পারে না, কারণ বেশিরভাগ মানুষই তাদের চাকরি হারিয়েছে এবং কারও কোনো আয়ের উৎস নেই। তাই অনেকে বাকিতে ফোন চার্জ দিতে আসে। কার কত দেনা জমা হচ্ছে তা লিখে রাখার জন্য আমার একটি নোটবুকই রয়েছে। কিছু পরিবারের ঋণ ৩০০ থেকে ৪০০ শেকেল পর্যন্ত জমে গেছে।’
যুদ্ধের আগে ৩৪ বছর বয়সী এই যুবক সপ্তাহে প্রায় ৪০০ থেকে ৫০০ শেকেল (১৩১-১৬৪ ডলার) আয় করতেন। আজ পুরো মাসজুড়ে কষ্টেসৃষ্টে তিনি ঠিক সমপরিমাণ টাকা আয় করেন। তিনি বলেন, ‘আমরা যা পারছি তা দিয়েই কেবল জীবন ধারণের চেষ্টা করছি। গাজায় আগে কখনোই এই ধরণের চার্জিং পয়েন্ট ছিল না। যুদ্ধের কারণে এমন পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হবে, তা আমরা কখনোই কল্পনা করিনি।’
