বিশ্বব্যাপী বাণিজ্য অনিশ্চয়তার মধ্যে দক্ষিণ-পশ্চিম এশিয়ার বাজারে নিজেদের উপস্থিতি আরও জোরালো করতে দক্ষিণ কোরিয়া ও বাংলাদেশ একটি সমন্বিত অর্থনৈতিক অংশীদারত্ব চুক্তি (কমপ্রিহেনসিভ ইকোনমিক পার্টনারশিপ অ্যাগ্রিমেন্ট—সিইপিএ) নিয়ে দ্বিতীয় দফা আলোচনা শুরু করতে যাচ্ছে। দক্ষিণ কোরিয়ার শিল্প মন্ত্রণালয় আজ সোমবার এ তথ্য জানিয়েছে।
দক্ষিণ কোরিয়ার সংবাদমাধ্যম ইয়ুনহাপের খবরে বলা হয়েছে, কোরিয়ার বাণিজ্য, শিল্প ও জ্বালানি মন্ত্রণালয় (মিনিস্ট্রি অব ট্রেড, ইন্ডাস্ট্রি অ্যান্ড রিসোর্সেস) জানিয়েছে—দুই দেশের বাণিজ্য প্রতিনিধিদল চার দিনব্যাপী এই আলোচনা চালাবে। আজ সোমবার থেকে শুরু হওয়া এই আলোচনা আগামী বৃহস্পতিবার পর্যন্ত চলবে। আলোচনার ভেন্যু ঢাকা।
দক্ষিণ কোরিয়া ও বাংলাদেশ আনুষ্ঠানিকভাবে ২০২৪ সালের নভেম্বর মাসে সিইপিএ আলোচনা শুরুর ঘোষণা দেয়। এর আগে প্রথম দফার আলোচনা অনুষ্ঠিত হয় গত বছরের আগস্ট মাসে সিউলে। মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, জনসংখ্যার দিক থেকে বাংলাদেশ বিশ্বের অষ্টম বৃহত্তম দেশ এবং দক্ষিণ-পশ্চিম এশিয়ার অন্যতম দ্রুত বর্ধনশীল অর্থনীতি।
বাণিজ্য চুক্তি আলোচনা বিষয়ক দায়িত্বে থাকা কোরিয়ার শিল্প মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তা সন হো-ইয়ং বলেন, বাংলাদেশের সঙ্গে সিইপিএ স্বাক্ষর হলে দক্ষিণ-পশ্চিম এশিয়ার বাজারে কোরিয়ান কোম্পানিগুলোর প্রবেশ অনেক সহজ হবে। তিনি বলেন, বাংলাদেশ একটি গুরুত্বপূর্ণ বাজার, যার রয়েছে উল্লেখযোগ্য প্রবৃদ্ধির সম্ভাবনা।
সিইপিএ মূলত এক ধরনের মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি, যেখানে শুধু বাজার উন্মুক্তকরণ নয়, বরং এর পাশাপাশি আরও বিস্তৃত অর্থনৈতিক সহযোগিতা ও বিনিময়ের ওপর জোর দেওয়া হয়।
দক্ষিণ কোরিয়ার ক্রমবর্ধমান উপস্থিতি বাংলাদেশের অর্থনীতিতে বড় ভূমিকা রাখছে। এটি শুধু অর্থনৈতিক সহযোগিতা নয়, বরং দুই দেশের কৌশলগত লক্ষ্য—বিশেষ করে বাংলাদেশের ডিজিটাল রূপান্তরের আকাঙ্ক্ষা এবং দুই দেশেরই অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির আগ্রহ—এই সবকিছুরই মিলনস্থল।
বর্তমানে বাংলাদেশে দক্ষিণ কোরিয়ার বিনিয়োগের পরিমাণ প্রায় ১ দশমিক ৫৬ বিলিয়ন ডলার, যা বাংলাদেশে তৃতীয় সর্বোচ্চ এফডিআই উৎস হিসেবে কোরিয়ার অবস্থানকে নিশ্চিত করেছে। ২০২৩ সালের পর থেকে দেশটি প্রতি বছর এই অবস্থানে উন্নতি করছে। ক্রমবর্ধমান এই ধারা স্পষ্ট করে যে, বাংলাদেশ দিন দিন দক্ষিণ কোরিয়ার বিনিয়োগকারীদের জন্য আরও বেশি আকর্ষণীয় হয়ে উঠছে।
২০২৪ সালে বাংলাদেশে ব্যাপক বিক্ষোভ ও রাজনৈতিক অস্থিরতার কারণে পদত্যাগ করে দেশ ছাড়েন দীর্ঘদিনের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। পরে নোবেলজয়ী ড. মুহাম্মদ ইউনূস অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান হিসেবে দায়িত্ব নেন। এই রাজনৈতিক পরিবর্তন প্রথম দিকে বিদেশি বিনিয়োগকারীদের মধ্যে সংশয় সৃষ্টি করলেও, ইউনূসের সরকারের সংস্কারের প্রতিশ্রুতি ফের নতুন করে আস্থা ফিরিয়ে আনে।
এর অন্যতম প্রমাণ, ২০২৫ সালে আয়োজিত বাংলাদেশের ইনভেস্টমেন্ট সামিট, যেখানে প্রায় ২ হাজার ৫০০ জন অংশগ্রহণকারী উপস্থিত ছিলেন—যার বেশির ভাগই ছিলেন বিদেশি বিনিয়োগকারী। যদি বাংলাদেশ এই সংস্কারপন্থী পথ ধরে এগিয়ে যেতে পারে, তাহলে দক্ষিণ কোরিয়ার মতো দেশের কাছে এটি আরও বেশি মূল্যবান বিনিয়োগ গন্তব্য হয়ে উঠবে। বাংলাদেশের ভৌগোলিক অবস্থান, তরুণ জনসংখ্যা এবং ক্রমবর্ধমান অর্থনৈতিক সম্ভাবনা—এই সবই বিদেশি বিনিয়োগ আকৃষ্ট করার জন্য যথেষ্ট।
