বাংলাদেশের নির্বাচনে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের (বিএনপি) নিরঙ্কুশ জয়ের পর নরেন্দ্র মোদি সামাজিক মাধ্যমে বাংলায় বার্তা দিয়ে তারেক রহমানকে অভিনন্দন জানান। অভিনন্দনের ভাষা ছিল ইতিবাচক, উষ্ণ কিন্তু সতর্ক। মোদি একটি 'গণতান্ত্রিক, প্রগতিশীল ও অন্তর্ভুক্তিমূলক' বাংলাদেশের প্রতি ভারতের সমর্থন জানান। একই সঙ্গে তিনি 'দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক আরও জোরদার করতে ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করার' আগ্রহ প্রকাশ করেন।
তবে, ২০২৪ সালের আন্দোলনের পর শেখ হাসিনা ভারতে আশ্রয় নেওয়ায় দুই দেশের সম্পর্কে টানাপোড়ন ও অবিশ্বাসের দেয়াল তৈরি হয়েছে। এর সঙ্গে সীমান্ত হত্যা, তিস্তার পানি বণ্টন, বাণিজ্য বাধা এবং উসকানিমূলক মন্তব্যের মতো পুরোনো ক্ষোভ যুক্ত হয়েছে। অনেক বাংলাদেশি মনে করেন, দিল্লি দীর্ঘদিন একটি কর্তৃত্ববাদী সরকারের প্রতি অতিরিক্ত সমর্থন দেখিয়েছে।
তবে দিল্লির সামনে প্রশ্ন এখন ‘সম্পর্ক রাখবে কি না’ তা নয়; বরং সম্পর্ক কীভাবে রাখবে তার ওপর।
বিএনপি দিল্লির কাছে অপরিচিত নয়। ২০০১ সালে খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে বিএনপি-জামায়াত জোট ক্ষমতায় এলে নিরাপত্তা ও কৌশলগত ইস্যুতে দুই দেশেই টানাপোড়ন বাড়ে। ২০০৪ সালের চট্টগ্রামের ১০ ট্রাক অস্ত্র মামলার ঘটনা ভারতীয় নিরাপত্তা মহলে গভীর উদ্বেগ তৈরি করে। এছাড়াও, ওয়াশিংটন, বেইজিং এবং ইসলামাবাদের সঙ্গে বিএনপির সম্পর্কের সহজ সমীকরণ দেখে দিল্লির সন্দেহ দানা বাঁধে যে, ঢাকা কৌশলগতভাবে সরে যাচ্ছে। পরিস্থিতি আরও খারাপ হয়, ২০১৪ সালে তৎকালীন বিরোধীদলীয় নেত্রী খালেদা জিয়া যখন ভারতের তৎকালীন রাষ্ট্রপতি প্রণব মুখার্জির সঙ্গে নির্ধারিত বৈঠক বাতিল করেন। নিরাপত্তার অজুহাত দেখানো হলেও একে দিল্লির প্রতি অবজ্ঞা হিসেবেই দেখা হয়েছিল। ফলে দিল্লি পরবর্তী সময়ে শেখ হাসিনার সরকারের ওপর বড় কৌশলগত বিনিয়োগ করে—বিশেষ করে উত্তর-পূর্ব ভারতের বিচ্ছিন্নতাবাদ দমনে সহযোগিতার কারণে।
এখন পরিস্থিতি বদলেছে। বিএনপি নেতৃত্ব ‘দিল্লি নয়, পিন্ডি নয়—সবার আগে বাংলাদেশ’ বলে একধরনের ভারসাম্য নীতির ইঙ্গিত দিচ্ছে। একই সময়ে পাকিস্তানের সঙ্গে সম্পর্ক উষ্ণ হওয়ার লক্ষণও দেখা যাচ্ছে- যা দিল্লির জন্য সংবেদনশীল। হাসিনার পতনের পর ঢাকা ইসলামাবাদের সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়নে সময় নষ্ট করেনি। ১৪ বছরের বিরতির পর গত মাসে ঢাকা-করাচি সরাসরি ফ্লাইট চালু হয়েছে। এর আগে ১৩ বছরের মধ্যে প্রথমবারের মতো পাকিস্তানের কোনো পররাষ্ট্রমন্ত্রী বাংলাদেশ সফর করেন। জ্যেষ্ঠ সামরিক কর্মকর্তারা সফর বিনিময় করেছেন, নিরাপত্তা সহযোগিতার বিষয়টি আবার আলোচনার টেবিলে এসেছে এবং ২০২৪-২৫ অর্থবছরে বাণিজ্য ২৭ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। বাস্তবতা হলো, ৪ হাজার কিলোমিটারের বেশি সীমান্ত, গভীর অর্থনৈতিক সংযোগ এবং আন্তঃনির্ভর নিরাপত্তা কাঠামো- দুই দেশকে আলাদা থাকার সুযোগ দেয় না।
দিল্লির ইনস্টিটিউট ফর ডিফেন্স স্টাডিজ অ্যান্ড অ্যানালাইসিসের স্মৃতি পট্টনায়ক, ওপি জিন্দাল গ্লোবাল ইউনিভার্সিটির আন্তর্জাতিক বিষয়ক অধ্যাপক শ্রীরাধা দত্ত ও রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, সম্পর্ক পুনর্গঠনের পথে কিছু বিষয় গুরুত্বপূর্ণ। দুই দেশেরই স্বার্থে নিরাপত্তা সহযোগিতা অব্যাহত রাখা। জনমনে বিরূপতা না বাড়াতে রাজনৈতিক বাকযুদ্ধ ও উসকানিমূলক মন্তব্য কমানো।এছাড়াও, হাসিনার প্রত্যার্পণ প্রশ্নে বাস্তববাদী ও নীরব কূটনীতি অনুসরণ।
ভারত যদি ‘বড় প্রতিবেশী’ হিসেবে আত্মবিশ্বাসী ও সংযত কূটনৈতিক উদ্যোগ নেয়, আর বিএনপি সরকার যদি ভারসাম্যপূর্ণ পররাষ্ট্রনীতি বজায় রাখে-তবে একটি ‘রিসেট’ সম্ভব। না হলে সম্পর্ক হয়তো পুরোপুরি ভাঙবে না, কিন্তু ‘নিয়ন্ত্রিত প্রতিদ্বন্দ্বিতার পর্যায়েই আটকে থাকবে।
শেষ পর্যন্ত, ভৌগোলিক বাস্তবতা ও অর্থনৈতিক স্বার্থই দুই দেশকে আবার টেবিলে বসতে বাধ্য করবে। প্রশ্ন শুধু—কে আগে এগিয়ে আসবে, এবং কতটা আন্তরিকভাবে।
