গত ২৫ বছরে মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের যতবার সামরিকভাবে ব্যর্থ হয়েছে, তার মধ্যে ইরান যুদ্ধ সম্ভবত সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ। আফগানিস্তান, ইরাক, ইয়েমেন, লিবিয়া ও সিরিয়ায় যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক হস্তক্ষেপের মতো ইরানের ক্ষেত্রে কোনো শাসনব্যবস্থার পতন ঘটেনি বা ইরান ইসলামি প্রজাতন্ত্র আরেকটি মার্কিন ‘রেজিম চেঞ্জ’ প্রচেষ্টা ঠেকিয়ে টিকেই থাকেনি, তারা যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের আরেকটি বড় পরিকল্পনাও ঠেকিয়ে দিয়েছে।
ইরানে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের যুদ্ধ শুধু একটি সরকারের ভবিষ্যৎ নিয়ে ছিল না। ছিল ইসরায়েলের এক বিশাল স্বপ্নপূরণের পথে অন্যতম বাধা দূর করার উপায়। ইরানকে দমনে ব্যর্থ হওয়া আসলে আরও বড় এক উচ্চাকাঙ্ক্ষা থামিয়ে দিয়েছে বা ভেঙে দিয়েছে। সেটি হলো—মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনৈতিক মানচিত্র নতুন করে গড়ে তোলার এক প্রকল্প, যার কেন্দ্রে পুনর্জাগরিত ও পুনরুজ্জীবিত এক ‘গ্রেটার বা বৃহত্তর ইসরায়েল।’
এই লক্ষ্যই ছিল আব্রাহাম অ্যাকর্ডসের কৌশলগত ভিত্তি। সৌদি আরব যখন এতে সই করতে অস্বীকৃতি জানায়, তখন ইরানের সঙ্গে যুদ্ধকে কার্যত তৈরি করা হয় বিকল্প পথ হিসেবে। বিদ্রূপের বিষয় হলো, ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর সবচেয়ে বড় স্বপ্ন ভেঙে দিলেন এমন একজন, যিনি হোয়াইট হাউসে ইসরায়েলের ‘সবচেয়ে বড় বন্ধু’ হিসেবে পরিচিত ছিলেন।
র্যাবিট হোল বা গোলকধাঁধা
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু যে ‘র্যাবিট হোল বা গোলকধাঁধায়’ নামতে আহ্বান জানিয়েছিলেন, সেখান থেকে বেরিয়ে আসার সিদ্ধান্ত ছিল একেবারে সহজ। কিন্তু নেতানিয়াহুর জন্য ইরান ইস্যুতে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্টের এই ইউ-টার্ন এক বিপর্যয় এবং এর প্রভাব বহু প্রজন্ম ধরে অনুভূত হতে পারে।
যুদ্ধের কারণে জ্বালানি ব্যয়ের বৃদ্ধি থেকে সৃষ্ট যুক্তরাষ্ট্রের মুদ্রাস্ফীতি এখন তিন বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ। ট্রাম্পের জনপ্রিয়তা নেমে গেছে ঐতিহাসিক নিম্নস্তরে। নিজ দলের ভেতরেই তিনি ক্রমবর্ধমান বিরোধিতার মুখে। উপসাগরীয় অর্থনীতির অচলাবস্থা ট্রাম্প পরিবারের আর্থিক স্বার্থেও আঘাত হানছে। আর সামনে রয়েছে মধ্যবর্তী নির্বাচন, যেখানে তিনি কংগ্রেসের উভয় কক্ষই হারাতে পারেন। তিনি ইরানে ভেনেজুয়েলা-ধাঁচের দ্রুত বিজয় চাইছিলেন। কিন্তু ইরান যে সহজে নতি স্বীকার করবে না, তা পরিষ্কার হওয়ার পর ৮০ বছর বয়সী এই প্রেসিডেন্ট মানসিকভাবে আগ্রহ হারিয়ে ফেলেন।
ইরানে যে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল বিজয় অর্জন করবে না—সেই বিষয়ে ইসরায়েলের যুদ্ধ-সংবাদদাতারা প্রায় একমত ছিলেন। ইসরায়েলি সংবাদমাধ্যম চ্যানেল ১৩-এর সামরিক প্রতিবেদক অ্যালান বেন ডেভিড বলেন, যুদ্ধ পরিস্থিতি পুরো পাল্টে দিয়েছে। যুদ্ধের আগে ইসরায়েলকে যুক্তরাষ্ট্রের সমর্থনে অঞ্চলের শীর্ষ সামরিক শক্তি হিসেবে ধরা যেত। যুদ্ধের পরে ইরান হয়ে উঠেছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শক্তি।
হারেৎজের সামরিক বিশ্লেষক আমোস হারেল লিখেছেন, যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্টের ইরানের সঙ্গে সমঝোতা নেতানিয়াহুর জন্য ৭ অক্টোবর ২০২৩-এর হামাস আক্রমণের পর থেকে সবচেয়ে বড় নিরাপত্তাগত ব্যর্থতা।
ট্রাম্পের ইউ-টার্নের পর ইসরায়েলের ডানপন্থী মহলে একধরনের সুর শুরু হয় যে ইসরায়েলের এখন ‘একাই এগিয়ে যাওয়া উচিত’। বিষয়টি মন্ত্রিসভাতেও আলোচিত হয়। এই ক্ষতে আরও লবণ ছিটিয়ে দেন ট্রাম্প। তিনি নিউইয়র্ক টাইমসকে বলেন, নেতানিয়াহুর তাঁর কাছে কৃতজ্ঞ থাকা উচিত। কারণ, ‘ইরানের পারমাণবিক অস্ত্র থাকলে ইসরায়েল দুই ঘণ্টাও টিকত না।’ মঙ্গলবার তিনি একই সুরে ফ্রান্সে জি-৭ শীর্ষ সম্মেলনে সাংবাদিকদের বলেন, যুক্তরাষ্ট্র ছাড়া ‘ইসরায়েলই থাকত না’ এবং যোগ করেন, চুক্তি স্বাক্ষরের দুই ঘণ্টা আগে ‘লেবাননে, বৈরুতে হামলা’ তিনি পছন্দ করেননি।
ইসরায়েলের ডানপন্থী ও সেক্যুলার বিরোধী নেতা অভিগদর লাইবারম্যান বলেন, ইসরায়েলের উচিত ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র শক্তি গড়ে তোলা এবং মোসাদকে কেবল ইরানের শাসন উৎখাতের প্রচেষ্টায় নিয়োজিত করা। কট্টর-ডানপন্থী অর্থমন্ত্রী বেজালেল স্মতরিচ ঘোষণা দেন, তাঁরা ‘নিজেদের এবং সৃজনশীল উপায়ে’ ইরানের এই সরকার উৎখাতের অভিযান চালিয়ে যাবেন। সাবেক প্রধানমন্ত্রী নাফতালি বেনেত বলেন, ‘আমি ইরানি রেজিমকে বলতে চাই...আমি হব তোমাদের জীবনের সবচেয়ে বড় দুঃস্বপ্ন।’
এক কৌশলগত বিপর্যয়
ইসরায়েলের আঞ্চলিক কৌশলের যে অংশগুলো নেতানিয়াহুর এই কৌশলগত পরাজয়ের পরও টিকে থাকতে পারে সেগুলো হলো—গাজা, দক্ষিণ লেবানন ও সিরিয়ায় দখলকৃত ও জনশূন্য করা ভূমি, আবুধাবির সঙ্গে অনানুষ্ঠানিক নিরাপত্তা চুক্তি, সোমালিল্যান্ডকে অগ্রবর্তী সামরিক ঘাঁটি হিসেবে ব্যবহার এবং এগুলো এখনো রয়ে গেছে।
এই প্রকল্প যেকোনো সময় আবারও এগিয়ে নেওয়া সম্ভব। কিন্তু নেতানিয়াহু যা হারিয়েছেন, তা হলো বর্তমান যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্টের তরফ থেকে ইসরায়েলের সেই স্বপ্নকে সমর্থন করার আগ্রহ। আর শিগগিরই এমন আরেকজনও আসবেন—এমন সম্ভাবনা কম। ফলে, অনেক সময় লাগবে। যত দিন না কোনো ভবিষ্যৎ ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী হোয়াইট হাউসের সিচুয়েশন রুমে বসে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্টের মুখোমুখি হতে পারবেন এবং সেখানে তাঁকে নানা কৌশলী বক্তব্য শুনিয়ে তাঁকে ইসরায়েলের পক্ষে ইরানের বিরুদ্ধে লড়তে প্রভাবিত করতে পারবেন।
ইসরায়েলের কেউ কি সত্যিই মনে করে, ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স প্রেসিডেন্ট হলে তিনি এমন কিছু মেনে নেবেন? এই ভূমিকম্পের মতো পরিবর্তন টের পেতে ইসরায়েলি এস্টাবলিশমেন্টের খুব বেশি সময় লাগেনি। মুহূর্তের মধ্যে তারা এটিকে ‘বিশ্বাসঘাতকতা’ বলে তারস্বরে চিৎকার করে ওঠেছে।
চ্যানেল ১৪-এর সাংবাদিক ইয়িনোন মাগাল—যিনি নেতানিয়াহুর মুখপাত্র হিসেবে পরিচিত—যুক্তরাষ্ট্রের বিশেষ দূত স্টিভ উইটকফ এবং জ্যারেড কুশনারকে ‘ছোট ইহুদি’ বলে আখ্যা দেন, যা প্রকাশ্য ইহুদিবিদ্বেষের এক নগ্ন উদাহরণ। তিনি যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্টকে ‘লুজার’ বলেন এবং ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্সকে ‘স্কাম বা আবর্জনা’ হিসেবে উল্লেখ করেন।
এক বিষাক্ত জোট
গাজার গণহত্যা পশ্চিমা বিশ্বের সেই পুরোনো মিথকে ভেঙে দিয়েছে, যেখানে বলা হতো—ইসরায়েল একটি গণতন্ত্রিক দেশ, তারা শান্তির জন্য সংগ্রাম করলেও তাদের ওপর কেবলই যুদ্ধ চাপিয়ে দেওয়া হয়। এই সময়ে আরেকটি মিথ ভেঙে গেছে, সামরিক মিত্র হিসেবে ইসরায়েল যুক্তরাষ্ট্রের কাছে বিশ্বাসযোগ্য। জনমত জরিপে যেমন স্পষ্ট পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে, তেমনি রাজনৈতিক প্রচারণার ভাষাতেও এসেছে দৃশ্যমান রূপান্তর। ইসরায়েলপন্থী সবচেয়ে শক্তিশালী লবিং গোষ্ঠী আইপ্যাক এখন ডেমোক্র্যাটদের মধ্যে বিষাক্ত হয়ে উঠছে।
যেসব তরুণ রাজনীতিকেরা উঠে আসছেন, তাঁদের অনেকেই আর ইসরায়েলের অর্থ নিতে আগ্রহী নন। আর রিপাবলিকানদের মধ্যে যে ধারণা ছিল—ইসরায়েল যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রনীতি নিয়ন্ত্রণ করে—তা এখন কেবল একটি ইহুদিবিদ্বেষী মিমের সীমায় নেই, বরং আরও বিস্তৃত আলোচনার বিষয় হয়ে উঠছে। যুক্তরাষ্ট্রে জনমতের এই পরিবর্তনকে খুব সতর্কভাবে বুঝে, বিভিন্ন আইন প্রণয়ন উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে যাতে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল সামরিক ও গোয়েন্দা জোটকে আরও গভীরভাবে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেওয়া যায়।
আইন অনুযায়ী একজন মার্কিন প্রেসিডেন্টকে ইসরায়েলের ‘গুণগত সামরিক শ্রেষ্ঠত্ব’ নিশ্চিত করতে হয়। এখন ইসরায়েলি লবিং গোষ্ঠী কংগ্রেসে পাস হওয়া বাধ্যতামূলক কিছু আইনে দুটি নতুন প্রস্তাব ঢোকানোর চেষ্টা করছে, যা যুক্তরাষ্ট্রের নীতিনির্ধারণে ইসরায়েলকে অগ্রাধিকার দেবে। প্রস্তাবিত একটি ব্যবস্থা জাতীয় প্রতিরক্ষা অনুমোদন আইনে ঢোকানো হচ্ছে, যেখানে একটি নির্বাহী সংস্থা গঠনের কথা বলা হয়েছে। এই সংস্থা যুক্তরাষ্ট্র সরকারের সব বিভাগে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের প্রতিরক্ষা ও নিরাপত্তা সহযোগিতাকে সমন্বিত ও একীভূত করার দায়িত্বে থাকবে।
এতে আরও বলা হচ্ছে, যুক্তরাষ্ট্রের বড় ধরনের প্রতিরক্ষা ক্রয়ে ইসরায়েলি প্রযুক্তি অন্তর্ভুক্ত করা বাধ্যতামূলক করতে হবে। গোয়েন্দা অনুমোদন আইনেও একটি প্রস্তাব আছে, যেখানে ইসরায়েলের সঙ্গে ব্যাপক গোয়েন্দা তথ্য ভাগাভাগির কথা বলা হয়েছে এবং সেইসঙ্গে যেসব আরব দেশ ইসরায়েলের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক করবে, তাদের সঙ্গেও একই ব্যবস্থা থাকবে।
ইসরায়েলি কৌশলের তৃতীয় দিক হলো এমন একটি অস্ত্র ও প্রযুক্তির সরবরাহ ব্যবস্থা তৈরি করা, যা কংগ্রেসকে পাশ কাটিয়ে কাজ করতে পারবে। এসব উদ্যোগ মূলত এমন একটি সামরিক সম্পর্ককে স্থায়ী কাঠামোয় বেঁধে ফেলার চেষ্টা, যা এখন যুক্তরাষ্ট্রের দুই দলীয় ব্যবস্থার মধ্যেই তীব্র রাজনৈতিক নজরদারির মুখে পড়ছে।
হারার পথে থাকা সমীকরণ
আবারও দেখা যাচ্ছে, ইসরায়েলকে সমর্থন করা এখন একধরনের জোরপূর্বক রাজনৈতিক অবস্থানে পরিণত হয়েছে। অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক বিতর্কের বিষয়কে সামরিক অভিযানের যুক্তিতে চাপিয়ে দেওয়া হচ্ছে। ইসরায়েলকে সমর্থনের রাজনৈতিক দায় যত বাড়ছে, ততই যুক্তরাষ্ট্রকে পাশে রাখতে ইসরায়েলের বাধ্যতামূলক চাপ প্রয়োগের মাত্রাও বাড়ছে। শেষ পর্যন্ত, ইসরায়েল এক ধরনের হারার পথে থাকা অবস্থানে দাঁড়িয়ে আছে।
এই চুক্তি বা সমীকরণে ইরান বরং একটি বড় আঞ্চলিক শক্তি হিসেবে আবির্ভূত হচ্ছে, যার কৌশলগত সক্ষমতা আরও শক্তিশালী হয়েছে। তাদের ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ কর্মসূচি এখনো বজায় আছে, যদিও তারা উচ্চমাত্রায় সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের কিছু অংশ ত্যাগ করেছে। আইএইএর ধারাবাহিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, ইরানের কখনোই কোনো আনুষ্ঠানিক পারমাণবিক অস্ত্র কর্মসূচি ছিল না। এবং ট্রাম্প যখন বারাক ওবামার সঙ্গে করা পারমাণবিক চুক্তি থেকে বেরিয়ে যান, তখনই তারা উচ্চমাত্রায় সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের মজুদ তৈরি শুরু করে—এটি বড় কোনো ছাড় নয়।
ট্রাম্প বারবার দাবি করবেন যে তিনি তেহরানকে বোমা বানানো থেকে থামিয়েছেন। কিন্তু তিনি বা মোসাদ কেউই ইরানের পারমাণবিক সক্ষমতাকে থামাতে পারবে না। প্রতিবছর যে পরিমাণ পারমাণবিক জ্ঞানে প্রশিক্ষিত স্নাতক তারা তৈরি করছে, তাতে এই জ্ঞান আর কখনোই ‘জ্বিন’কে বোতলে ফেরত ঢোকানোর মতো বিষয় নয়।
ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র বাহিনীও তাদের অবস্থান বজায় রেখেছে, যা প্রতিরোধ শক্তি হিসেবে কার্যকর প্রমাণিত হয়েছে। এই বাহিনী যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনীর সবচেয়ে শক্তিশালী ও নির্ভুল বোমাবর্ষণের মুখেও টিকে আছে।
ইরানের আঞ্চলিক অরাষ্ট্রীয় মিত্রদের সঙ্গে সম্পর্কও আগের তুলনায় আরও শক্তিশালী হয়েছে। বরং এই যুদ্ধ এই জোটকে একটি কার্যকর যুদ্ধক্ষম ইউনিটে পরিণত করেছে, যা ইসরায়েল ও উপসাগরীয় রাষ্ট্রগুলোর বিরুদ্ধে সমন্বিত হামলা চালাতে সক্ষম।
নিরস্ত্রীকরণ এখনো যুক্তরাষ্ট্রের একধরনের স্বপ্ন, কিন্তু লেবাননে তা বাস্তবতা থেকে বহু দূরে—যেমন ট্রাম্পের ইরান-সংক্রান্ত ধারণাও ছিল। বরং ইরান দেখিয়েছে, তার মিত্ররা কেবল ক্ষমতা প্রদর্শনের হাতিয়ার নয়, যাদের ইচ্ছেমতো চালু বা বন্ধ করা যায় না; বরং ইরান তাদের রক্ষায় সত্যিই প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। ইরান ও লেবাননের হিজবুল্লাহর সম্পর্ক পারস্পরিক। এই সপ্তাহে দক্ষিণ বৈরুতের হিজবুল্লাহ ঘাঁটি দাহিয়ায় প্রবেশপথে খামেনি ও তাঁর পুত্রের পোস্টার দেখা গেছে, যেখানে বড় করে লেখা ছিল ‘ধন্যবাদ।’
এ সবকিছুই উপসাগরীয় অঞ্চলের যুদ্ধ-পরবর্তী বাস্তবতাকে এক গভীর অনিশ্চয়তার ঘূর্ণিতে ঠেলে দিয়েছে। তাদের সম্পদ ও অজেয়তার বুদবুদ ফেটে গেছে।
সবার নজর এখন গাজার দিকে
যদি ট্রাম্প তাঁর চুক্তির দিকটি ভঙ্গ করেন, অথবা যদি ইসরায়েল আবারও হামলা চালায়, তাহলে ইরান হরমুজ প্রণালি যত দ্রুত ও সহজে খুলেছিল, ঠিক ততটাই দ্রুত সেটি বন্ধ করতে পারে। সেই অনুযায়ী, যেভাবেই হোক না কেন, ইরান বিশাল এই পেট্রল, গ্যাস ও তেলজাত পণ্যের প্রবাহের ‘গেটকিপার’ হওয়ার বিশেষ সুবিধার একটি মূল্য আদায় করবেই।
অনেক কিছুই নির্ভর করবে ইরান কীভাবে তার প্রতিবেশীদের ওপর নিজের ক্ষমতা ব্যবহার করে তার ওপর। ইসরায়েলের মতো ‘বিজয়ী মানেই সব’ ধরনের নীতি অনুসরণ করা বুদ্ধিমানের কাজ হবে না।
আহত নেতানিয়াহু আঞ্চলিক ক্ষমতায় তার ক্ষতির ক্ষতিপূরণ দিতে ফিলিস্তিনিদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ আরও তীব্র করার প্রলোভনে পড়বেন। যেখানে ইসরায়েলি সশস্ত্র শাসকদের সঙ্গে দেখা হলেই তারা অবিশ্বাস্য মাত্রার বর্ণবাদের মুখোমুখি হয়, চেকপয়েন্টে নির্বিচারে লক্ষ্যবস্তু হয়ে হত্যা করা হয়, সেখানে ফিলিস্তিনিরা কেবল আশা করতে পারে যে নেতানিয়াহু প্রতিশোধের মতো করে তার ভূমি ‘পরিষ্কার করার’ প্রকল্প আরও নির্মমভাবে চালিয়ে যাবেন। ইসরায়েল ফিলিস্তিনিদের একধরনের ধারাবাহিক হত্যাকারী রাষ্ট্রে পরিণত হয়েছে, এবং যত বেশি তারা হত্যা করছে, তত বেশি হত্যার প্রয়োজন যেন তাদের তৈরি হচ্ছে।
ট্রাম্প কিংবা হাস্যকরভাবে ‘বোর্ড অব পিস’ নামে নামকরণ করা সংস্থাটিও নেতানিয়াহুকে গাজায় ক্রমবর্ধমান বড় অংশের নিয়ন্ত্রণ নিতে বাধা দিতে পারবে না। হামাস কোনোভাবেই অস্ত্র ত্যাগ করবে না, যেমন হিজবুল্লাহ বা ইরানও করবে না। এমনকি ইসরায়েল যদি পুরো গাজা পুনরায় দখলও করে, তাদের জন্য সমস্যাটি একই রয়ে যাবে।
গাজা দেখিয়েছে—এর সামাজিক কাঠামো এমন শক্তিশালী যে এটিতে আরোপিত নজিরবিহীন নিপীড়নও সহ্য করতে সক্ষম। গাজা ভাঙবে না। প্রতিটি পরিবার দাঁড়িয়ে আছে তাদের অনাবিষ্কৃত সমাহিত বন্ধু ও আত্মীয়দের কবরের ওপর এবং তারা এখন আর সেই ভূমি ছেড়ে যাবে না। যদি নেতানিয়াহু আবার গাজায় আক্রমণ শুরু করেন, বিশ্বজনমত আবারও আগুনের মতো জ্বলে উঠবে এবং ইসরায়েল দেখতে পাবে যে একটি বৈশ্বিক ব্যবসায়িক বয়কট সহ্য করার মতো অবস্থায় তার অর্থনীতি নেই।
মধ্যপ্রাচ্য সত্যিই বদলেছে, তবে নেতানিয়াহু যেমনটি চেয়েছিলেন তেমনভাবে নয়। ইরানের ওপর তার আক্রমণ ইসরায়েল ও তার প্রধান মিত্রের মধ্যে গত এক-চতুর্থাংশ শতাব্দীতে প্রথম বড় কৌশলগত ফাটল তৈরি করেছে। এর ফলে ইরানের সফট পাওয়ার বেড়েছে, আর ফিলিস্তিন, লেবানন এবং পুরো অঞ্চলে প্রতিরোধের মনোবল আগের চেয়ে বেশি শক্তিশালী হয়েছে—যদিও সিরিয়া এখন ইরানের প্রভাববলয় থেকে বাইরে।
তার অবিরাম যুদ্ধ এবং সম্প্রসারণবাদী মতাদর্শ নিয়ে ইসরায়েল একা একসময় দেখতে পাবে, তারা তাদের সামরিক শক্তির সীমায় পৌঁছে গেছে এবং পিছু হটা অবশ্যম্ভাবী হয়ে উঠবে। এটি সিরিয়ার ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য হবে, যেমন শেষ পর্যন্ত লেবাননের ক্ষেত্রেও হবে। এমন একটি প্রকল্পে জড়িয়ে পড়া শেষ পর্যন্ত ইসরায়েলের সবচেয়ে বড় ভুল হিসেবে প্রমাণিত হতে পারে।
