- বুধবার ১৭ জুন ২০২৬

| আষাঢ় ৪ ১৪৩৩ -

Tokyo Bangla News || টোকিও বাংলা নিউজ

চিকেন’স নেক ঘিরে পশ্চিমবঙ্গের একাধিক পরিকল্পনা, কী আছে এতে

আন্তর্জাতিক ডেস্ক

প্রকাশিত: ১৭:৪৪, ১৬ জুন ২০২৬

চিকেন’স নেক ঘিরে পশ্চিমবঙ্গের একাধিক পরিকল্পনা, কী আছে এতে

প্রতিটি রাজনৈতিক পালাবদলের সঙ্গে সঙ্গে বিলবোর্ডের ভাষাও বদলায়। তাই পশ্চিমবঙ্গের জনপরিসরে এখন শুভেন্দু অধিকারীর বিলবোর্ড ও পোস্টার প্রাধান্য পাবে, এটাই স্বাভাবিক। তবে এবার আরও গভীর কৌশলগত প্রভাবশালী এক পরিবর্তন ঘটছে—শিলিগুড়ি করিডরকে আরও শক্তিশালী করা এবং সীমান্ত সড়ক ও সীমান্ত বেড়া নির্মাণের জন্য জমি অধিগ্রহণকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়া।

শুভেন্দু অধিকারীর পশ্চিমবঙ্গ সরকার ৬০ কিলোমিটার দীর্ঘ ও ২২ কিলোমিটার প্রশস্ত শিলিগুড়ি করিডরকে শক্তিশালী করার একাধিক পদক্ষেপ নিয়েছে। এই করিডর ভারতের আটটি উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্যকে দেশের বাকি অংশের সঙ্গে যুক্ত করে। সাধারণভাবে একে বলা হয় ‘চিকেনস নেক’। এই সরু ভূখণ্ড বরাবরই ভারতের জন্য একটি বড় কৌশলগত চ্যালেঞ্জ।

এই চিকেন নেকের দক্ষিণ ও পশ্চিমে বাংলাদেশ এবং উত্তরে চীনের তিব্বত (চীন)। আর মাঝে অবস্থিত শিলিগুড়ি করিডর ভারতকে প্রতিবেশী নেপাল, বাংলাদেশ ও ভুটানের সঙ্গেও সংযুক্ত করেছে। একই সঙ্গে এটি যুক্ত রয়েছে চুম্বি উপত্যকার সঙ্গে, যা ভারত (সিকিম), চীন (তিব্বত) এবং ভুটানের ত্রিসীমানা সংলগ্ন অত্যন্ত কৌশলগত ও বিতর্কিত অঞ্চল। করিডরটির সীমান্ত রয়েছে নেপাল, ভুটান ও বাংলাদেশের সঙ্গে এবং এটি চুম্বি উপত্যকা থেকে মাত্র ১৩০ কিলোমিটার দূরে।

মহাসড়ক, উচ্চগতির রেল ও আসাম পর্যন্ত ভূগর্ভস্থ রেল সংযোগ

সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে করিডরটিকে ঘিরে তিনটি গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। গত মাসে পশ্চিমবঙ্গ সরকার নীতিগতভাবে সাতটি জাতীয় মহাসড়কের অংশ ভারতীয় জাতীয় মহাসড়ক কর্তৃপক্ষ (এনএইচএআই) এবং ন্যাশনাল হাইওয়েজ অ্যান্ড ইনফ্রাস্ট্রাকচার ডেভেলপমেন্ট করপোরেশন লিমিটেডের (এনএইচআইডিসিএল) কাছে হস্তান্তরের অনুমোদন দিয়েছে। এর ফলে দীর্ঘদিন ধরে ঝুলে থাকা গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো প্রকল্পগুলোর কাজ এগোনোর পথ তৈরি হয়েছে।

এই সড়ক অংশগুলো আগে রাজ্যের গণপূর্ত দপ্তরের (পিডব্লিউডি) জাতীয় মহাসড়ক শাখার অধীনে ছিল। কেন্দ্রীয় সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক মন্ত্রণালয়ের একাধিক অনুরোধ সত্ত্বেও প্রায় এক বছর ধরে হস্তান্তর প্রস্তাবগুলো আটকে ছিল। এসবের মধ্যে রয়েছে—ভারতের বাংলাদেশ সীমান্ত ঘেঁষে জঙ্গিপুর, ওমরপুর, কৃষ্ণনগর, বনগাঁ ও বসিরহাট হয়ে ঘোজাডাঙ্গা পর্যন্ত ৩২৯ দশমিক ৬ কিলোমিটার দীর্ঘ এনএইচ-৩১২। পাশাপাশি বিহার-পশ্চিমবঙ্গ সীমান্ত থেকে গাজোল পর্যন্ত এনএইচ-৩১ এবং ফরাক্কা পর্যন্ত এনএইচ-৩৩।

এ ছাড়া, নতুন এনএইচ-১০-এর অধীনে সেভক আর্মি ক্যান্টনমেন্ট-করোনেশন ব্রিজ-কালিম্পং-পশ্চিমবঙ্গ-সিকিম সীমান্ত সড়কসহ আরও চারটি অংশ এনএইচআইডিসিএলের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে, যা কেন্দ্রীয় সরকারের একটি পাবলিক সেক্টর সংস্থা।

ভারত-ভুটান সীমান্ত পর্যন্ত হাসিমারা-জয়গাঁও অংশ, বাংলাদেশ সীমান্ত পর্যন্ত বারাদিঘি-ময়নাগুড়ি-চ্যাংড়াবান্ধা রুট এবং শিলিগুড়ি-কুর্সিয়ং-দার্জিলিং পাহাড়ি সড়কও এখন সরাসরি কেন্দ্রীয় সরকারের তত্ত্বাবধানে থাকবে। পশ্চিমবঙ্গ সরকারের প্রেস নোটে বলা হয়েছে, এই সাতটি অংশে অবকাঠামো উন্নয়ন সিকিম, ভুটান ও বাংলাদেশের সঙ্গে সংযোগ আরও জোরদার করবে এবং উত্তরবঙ্গ ও ডুয়ার্স অঞ্চলের যোগাযোগব্যবস্থার উন্নতি ঘটাবে।

এদিকে, রেলমন্ত্রী অশ্বিনী বৈষ্ণবও নয়াদিল্লি থেকে নিউ জলপাইগুড়ি (শিলিগুড়ি) পর্যন্ত বুলেট ট্রেন চালুর ঘোষণা দিয়েছেন। এতে যাত্রাসময় ২০ ঘণ্টা থেকে কমে মাত্র ৬ ঘণ্টায় নেমে আসবে। ফলে ভৌগোলিক দূরত্বের পাশাপাশি মানসিক দূরত্বও কমবে। মন্ত্রী আরও জানিয়েছেন, কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ ‘চিকেনস নেক’ বরাবর উত্তর দিনাজপুর জেলার তিনমাইল হাট থেকে রংপানি এবং সেখান থেকে বাগডোগরা পর্যন্ত প্রস্তাবিত ভূগর্ভস্থ রেলপথ নির্মাণের কাজ দ্রুত এগিয়ে নেওয়া হবে।

এই প্রকল্পটি উত্তর-পূর্ব সীমান্ত রেলওয়ের কাটিহার ডিভিশনের আওতায়। এটি পশ্চিমবঙ্গের দার্জিলিং ও উত্তর দিনাজপুর এবং বিহারের কিশনগঞ্জ জেলার অংশজুড়ে বিস্তৃত। এই প্রকল্পের লক্ষ্য হলো—কৌশলগতভাবে সংবেদনশীল এই করিডরে নিরাপদ, নির্ভরযোগ্য ও নিরবচ্ছিন্ন রেল যোগাযোগ নিশ্চিত করা।

আসামের মুখ্যমন্ত্রী হিমন্ত বিশ্ব শর্মা এই ভূগর্ভস্থ রেল সংযোগকে একটি বড় কৌশলগত অগ্রগতি হিসেবে উল্লেখ করেছেন। তাঁর মতে, এটি উত্তর-পূর্বাঞ্চল ও ভারতের বাকি অংশের মধ্যে একটি নিরাপদ ও ত্রুটিহীন পরিবহন করিডর তৈরি করবে।

ভিন্ন বাস্তবতা: নেপাল, ভুটান ও বাংলাদেশের সীমান্ত

এই সীমান্ত অঞ্চলে প্রতিবেশী দেশগুলোর সঙ্গে ভারতের সম্পর্কের শক্তি ও চ্যালেঞ্জ কোথায়? ভুটান ও নেপালের সঙ্গে ভারতের সম্পর্ক বাংলাদেশের তুলনায় ভিন্ন ধরনের। ভারতীয় নাগরিকেরা ভিসা ছাড়াই নেপাল ও ভুটানে ভ্রমণ করতে পারেন এবং বৈধ পাসপোর্ট থাকলেই প্রবেশ সম্ভব। একই সুবিধা ভারতও এই দুই দেশের নাগরিকদের দিয়ে থাকে।

অন্যদিকে বাংলাদেশে যেতে ভিসা প্রয়োজন হয়। আগে পশ্চিমবঙ্গ ও উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্যগুলোর বাসিন্দারা জেলা প্রশাসকের দেওয়া সীমিত পরিসরের ভারত-বাংলাদেশ পাসপোর্ট ব্যবহার করে যাতায়াত করতে পারতেন। তবে ২০১৩ সালে সেই ব্যবস্থা বন্ধ করে দেওয়া হয়।

ভারত-নেপাল ও ভারত-ভুটান সীমান্তের তুলনায় ভারত-বাংলাদেশ সীমান্ত অনেক বেশি কড়াভাবে সুরক্ষিত। এরই মধ্যে ১ হাজার ৬৪৭ দশমিক ৭ কিলোমিটার এলাকায় সীমান্ত বেড়া নির্মাণ সম্পন্ন হয়েছে এবং অধিকারী সরকার অবশিষ্ট অংশের কাজ দ্রুত শেষ করতে জমি হস্তান্তর প্রক্রিয়া ত্বরান্বিত করেছে। এনএইচএআইয়ের আরও দুটি উদ্যোগ শিলিগুড়ি করিডরকে কেন্দ্রীয় সরকারের ফ্ল্যাগশিপ মহাসড়ক কর্মসূচি ‘ভারতমালা পরিকল্পনা’র লজিস্টিক কাঠামোর সঙ্গে একীভূত করতে সহায়তা করবে।

এর একটি হলো গোরখপুর-শিলিগুড়ি এক্সপ্রেসওয়ে। উত্তর প্রদেশের গোরখপুর থেকে শিলিগুড়ি পর্যন্ত ৫১৯ কিলোমিটার দীর্ঘ নিয়ন্ত্রিত প্রবেশাধিকারযুক্ত গ্রিনফিল্ড এক্সপ্রেসওয়েটি ভারত-নেপাল সীমান্তের প্রায় সমান্তরালে নির্মিত হবে।

এটি দুই প্রান্তের মধ্যে যাতায়াতের সময় উল্লেখযোগ্যভাবে কমাবে এবং ভারত-নেপাল সীমান্ত এলাকায় বাণিজ্য ও মানুষের চলাচল বাড়াবে। আরেকটি প্রকল্প হলো ৫০৬ কিলোমিটার দীর্ঘ খড়গপুর-শিলিগুড়ি অর্থনৈতিক করিডর। এটি বর্ধমান, মোরগ্রাম, মালদা ও রায়গঞ্জ হয়ে উত্তরবঙ্গকে বন্দরনগরী খড়গপুরের সঙ্গে যুক্ত করবে।

এই করিডর পণ্য পরিবহনকে আরও গতিশীল করবে, আঞ্চলিক অর্থনৈতিক সংযোগ বাড়াবে এবং পথে থাকা চা, পাট ও কৃষিপণ্যভিত্তিক বাণিজ্যকেন্দ্রগুলোকে লজিস্টিক সহায়তা দেবে।

তথ্যসূত্র: দ্য ওয়্যার

আরো পড়ুন