ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু ফেব্রুয়ারির শেষ দিনে যখন ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল যৌথ যুদ্ধ শুরু করেন, তখন ইসরায়েলের লক্ষ্যগুলো বেশ স্পষ্ট বলেই মনে হয়েছিল। লক্ষ্য ছিল ইরানের পারমাণবিক ও ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি ভেঙে দেওয়া এবং শেষ পর্যন্ত ইরানের সরকারের পতন ঘটানো। কিন্তু এখন, ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে চুক্তি স্বাক্ষরের পর এবং সুইজারল্যান্ডে দুই দেশের মধ্যে আলোচনা চলমান অবস্থায় প্রকাশিত নতুন এক জরিপে দেখা গেছে, ৯২ শতাংশ ইসরায়েলি মনে করেন এই যুদ্ধে জয়ী হয়েছে ইরান।
লন্ডন থেকে প্রকাশিত মধ্যপ্রাচ্যকেন্দ্রিক সংবাদমাধ্যম মিডল ইস্ট আইয়ের খবরে বলা হয়েছে, জেরুসালেমের হিব্রু বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিচালিত ওই জরিপে দেখা যায়—ইসরায়েলিরা বিপুলভাবে এই যুদ্ধ এবং পরবর্তীতে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে হওয়া সমঝোতাকে নেতিবাচকভাবে দেখছেন। জরিপে অংশ নেওয়া ৮৩ শতাংশ মনে করেন, এই সামরিক অভিযান দীর্ঘমেয়াদে ইসরায়েলের নিরাপত্তাকে দুর্বল করেছে। আর ৮৬ শতাংশ পুরো ফলাফল নিয়ে নেতিবাচক অনুভূতি প্রকাশ করেছেন।
জনমতের এই চিত্র ইসরায়েলের রাজনৈতিক ও সামরিক অভিজাত মহলের মনোভাবের সঙ্গেও মিলে যায়। তাঁদের অনেকেই মনে করছেন, ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধের সমাপ্তি এমন এক মোড় নির্দেশ করছে, যা মধ্যপ্রাচ্যে ইসরায়েলের আঞ্চলিক প্রভাবকে দুর্বল করে দিতে পারে। জরিপে আরও দেখা গেছে, ৭২ দশমিক ৫ শতাংশ ইসরায়েলি বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর সেই দাবি বিশ্বাস করেন না, যেখানে তিনি বলেছেন ইসরায়েল বড় ধরনের সাফল্য অর্জন করেছে এবং একটি অস্তিত্বগত হুমকি দূর করেছে। এই মনোভাব একই সঙ্গে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে তাঁর ভবিষ্যৎ নিয়েও বাড়তে থাকা অনিশ্চয়তার প্রতিফলন।
জরিপে অংশ নেওয়া প্রায় ৮৮ শতাংশ বলেছেন, ইসরায়েল হয় তাদের লক্ষ্য অর্জনে ব্যর্থ হয়েছে, নয়তো আংশিকভাবে সফল হয়েছে। আর ৫৬ শতাংশের মতে, ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ পরিচালনায় নেতানিয়াহুর ভূমিকা ছিল দুর্বল অথবা সম্পূর্ণ ব্যর্থ।
তবে যুদ্ধের পর ইরান যেভাবে উঠে এসেছে, সে বিষয়ে এই নেতিবাচক মূল্যায়ন লেবানন থেকে ইসরায়েলের সরে যাওয়ার দাবিতে রূপ নেয়নি। কারণ, ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যকার আলোচনায় লেবাননের প্রশ্নটি বড় এক অচলাবস্থার কারণ হয়ে রয়েছে। ইরান জোর দিয়ে বলেছে, যতক্ষণ পর্যন্ত ইসরায়েল লেবাননে বোমাবর্ষণ চালিয়ে যাবে এবং দক্ষিণ লেবাননের ভেতরে কয়েক কিলোমিটার এলাকায় ইসরায়েলি সেনারা অবস্থান করবে, ততক্ষণ কোনো যুদ্ধবিরতি কার্যকরভাবে টিকতে পারে না।
জরিপ অনুযায়ী, ৪৮ শতাংশ ইসরায়েলি লেবাননে ইসরায়েলের সামরিক অভিযানকে সমর্থন করেন। ইসরায়েলের দাবি, এই অভিযান মূলত ইরানঘনিষ্ঠ রাজনৈতিক দল ও সশস্ত্র গোষ্ঠী হিজবুল্লাহকে লক্ষ্য করেই পরিচালিত হচ্ছে। জরিপে অংশ নেওয়া এই সমর্থকদের মধ্যে অনেকে এমন অবস্থানও নিয়েছেন যে, এই অভিযান যদি যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে সরাসরি উত্তেজনার ঝুঁকিও তৈরি করে, তবুও তাঁরা সমর্থন অব্যাহত রাখবেন।
আগাম ইনস্টিটিউট এবং জেরুজালেমের হিব্রু বিশ্ববিদ্যালয়ের যৌথ উদ্যোগে ১৭ জুন থেকে ২০ জুনের মধ্যে এই জরিপ পরিচালিত হয়। এতে ১৭ বছর বা তার বেশি বয়সী ৩ হাজার ৬৪৪ জন ইসরায়েলির মতামত নেওয়া হয়। জনসংখ্যার বাস্তব চিত্র প্রতিফলিত করতে ওজনভিত্তিক নমুনা পদ্ধতি ব্যবহার করা হয়েছে। জরিপকারীদের ভাষ্য অনুযায়ী, ৯৯ শতাংশ আস্থার স্তরে এই জরিপের সর্বোচ্চ নমুনাগত ত্রুটির হার ছিল ২ দশমিক ২ শতাংশ।
