- বৃহস্পতিবার ২৯ জানুয়ারি ২০২৬

| মাঘ ১৬ ১৪৩২ -

Tokyo Bangla News || টোকিও বাংলা নিউজ

অর্থনৈতিক অংশীদারি চুক্তি

জাপানের সঙ্গে বাণিজ্যিক সম্পর্ক বৃদ্ধিতে বড় পদক্ষেপ

প্রকাশিত: ১৫:১১, ২৯ জানুয়ারি ২০২৬

জাপানের সঙ্গে বাণিজ্যিক সম্পর্ক বৃদ্ধিতে বড় পদক্ষেপ

চলতি বছরের নভেম্বরে স্বল্পোন্নত দেশের (এলডিসি) তালিকা থেকে উত্তরণ করবে বাংলাদেশ। এ উত্তরণ একটি অর্জন হলেও রপ্তানি বাণিজ্যের ক্ষেত্রে বড় ধরনের চ্যালেঞ্জও বয়ে আনবে। কারণ এলডিসি থেকে বেরিয়ে আসার সঙ্গে সঙ্গে বাংলাদেশের শুল্কমুক্ত বাজার সুবিধা ধীরে ধীরে হারিয়ে যাবে। এমন বাস্তবতায় জাপানের সঙ্গে স্বাক্ষরিত হচ্ছে অর্থনৈতিক অংশীদারি চুক্তি (ইপিএ)। সরকারের এ উদ্যোগকে সময়োপযোগী ও কৌশলগত সিদ্ধান্ত হিসেবে দেখছেন অর্থনীতিবিদ ও বিশ্লেষকরা। জানা যায়, বর্তমানে বাংলাদেশের প্রায় ৭৩ শতাংশ রপ্তানি এলডিসি-সংক্রান্ত বাণিজ্য সুবিধার ওপর নির্ভরশীল। এলডিসি সুবিধা শেষ হলে দেশের বার্ষিক রপ্তানি আয় প্রায় ৮০০ কোটি ডলার পর্যন্ত কমে যেতে পারে বলে আশঙ্কার কথা উঠে এসেছে বিভিন্ন গবেষণায়।

এ প্রেক্ষাপটে জাপানের সঙ্গে ইপিএ বাংলাদেশের জন্য একটি বড় নিরাপত্তাবলয় তৈরি করবে বলে মনে করছেন অর্থনীতিবিদরা। এ চুক্তি কার্যকর হলে জাপান বাংলাদেশের ৭ হাজার ৩৭৯টি পণ্যে শুল্কমুক্ত সুবিধা দেবে, যা দেশের মোট রপ্তানির প্রায় ৯৭ শতাংশ। তৈরি পোশাক খাত, যা দেশের প্রধান রপ্তানি খাত, চুক্তির মাধ্যমে সবচেয়ে বেশি লাভবান হবে। এ চুক্তি কেবল শুল্ক কমানোর মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। এতে বিনিয়োগ, সেবা বাণিজ্য, শ্রমমান, নিয়ন্ত্রক সহযোগিতা ও নীতিমালা মান্যতার মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয় অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।

বিশেষ করে সেবা খাতে বাংলাদেশ জাপানের জন্য ১২টি খাতের ৯৭টি উপ-খাত উন্মুক্ত করছে, আর জাপান বাংলাদেশের জন্য ১২০টি উপ-খাত খুলে দিচ্ছে। চুক্তিতে অন্তর্ভুক্ত সিঙ্গেল-স্টেজ ট্রান্সফরমেশন বিধানটি তৈরি পোশাক খাতের জন্য বিশেষ গুরুত্ব বহন করে। এতদিন কঠোর ‘রুলস অব অরিজিন’-এর কারণে অনেক ক্ষেত্রে বাংলাদেশি রপ্তানিকারকরা পূর্ণ সুবিধা নিতে পারতেন না। নতুন বিধান কার্যকর হলে পোশাক রপ্তানিতে শর্ত সহজ হবে এবং জাপানি বাজারে প্রতিযোগিতায় বাংলাদেশের অবস্থান আরও শক্তিশালী হবে।

এ ছাড়া এ চুক্তির ফলে তথ্যপ্রযুক্তি, লজিস্টিকস, স্বাস্থ্যসেবা, অবকাঠামো ও পেশাদার সেবা খাতে জাপানি বিনিয়োগ ও প্রযুক্তি হস্তান্তরের সুযোগ তৈরি হবে। এ চুক্তির আওতায় বাংলাদেশ ১ হাজার ৩৯টি জাপানি পণ্যে শুল্কমুক্ত সুবিধা দেবে, যা ১৮ বছরে ধাপে ধাপে কার্যকর হবে। এতে স্বল্পমেয়াদে দেশি কিছু শিল্প প্রতিযোগিতার চাপে পড়তে পারে। তবে দীর্ঘমেয়াদে উন্নত প্রযুক্তি, মানসম্পন্ন কাঁচামাল ও যন্ত্রপাতি আমদানির সুযোগ বাড়লে শিল্প খাতের সক্ষমতা বাড়বে বলে আশা করা হচ্ছে।

এ বিষয়ে পলিসি একচেঞ্জ বাংলাদেশের চেয়ারম্যান মাশরুর রিয়াজ বলেন,  এ চুক্তি ইউরোপীয় ইউনিয়ন, যুক্তরাজ্য, কানাডা ও দক্ষিণ কোরিয়ার মতো বাজারের সঙ্গে ভবিষ্যৎ বাণিজ্য আলোচনার ক্ষেত্রেও বাংলাদেশের অবস্থানকে শক্তিশালী করবে।

রিসার্চ অ্যান্ড পলিসি ইন্টিগ্রেশন ফর ডেভেলপমেন্টের চেয়ারম্যান মোহাম্মদ আবদুর রাজ্জাকের মতে, জাপানের সঙ্গে চুক্তি কেবল একটি বাণিজ্য চুক্তি নয়, এটি বিশ্ববাজারে বাংলাদেশের সক্ষমতার একটি বার্তা। এর মাধ্যমে প্রমাণ হয়, বাংলাদেশ বড় বৈশ্বিক অংশীদারদের সঙ্গে জটিল ও বিস্তৃত বাণিজ্য চুক্তি করতে প্রস্তুত। বর্তমানে বাংলাদেশে জাপানের বিনিয়োগের পরিমাণ প্রায় ৫০ কোটি ডলার, যা জাপানের বৈশ্বিক বিনিয়োগের তুলনায় খুবই কম।

তবে বিশ্লেষকরা মনে করছেন, ইপিএ বিনিয়োগের ক্ষেত্রে আস্থার সংকেত দিলেও, বিনিয়োগ আকর্ষণে দেশের অভ্যন্তরীণ চ্যালেঞ্জগুলো এখনো বড় বাধা। জমিসংকট, জ্বালানি সরবরাহের অনিশ্চয়তা, আমলাতান্ত্রিক জটিলতা এবং নীতিনির্ধারণে ধারাবাহিকতার অভাবের বিষয়গুলো সমাধান না হলে চুক্তি থেকে প্রত্যাশিত বিনিয়োগ পুরোপুরি আসবে না বলে মনে করছেন তারা। এ বিষয়ে মাশরুর রিয়াজ বলেন,  এলডিসি উত্তরণ-পরবর্তী অনিশ্চয়তার সময়ে জাপানের সঙ্গে ইপিএ বাংলাদেশের জন্য একটি বড় কৌশলগত সুযোগ। তবে এ সুযোগ কাগজে-কলমে সীমাবদ্ধ থাকবে, নাকি বাস্তব অর্থনৈতিক সুফলে রূপ নেবে তা নির্ভর করবে সরকারের নীতিগত প্রস্তুতি, সংস্কারের গতি এবং বেসরকারি খাতের সক্ষমতার ওপর।

বিশ্লেষকরা বলছেন, ইপিএ কার্যকর হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হবে বাস্তবায়ন। শুল্ক ব্যবস্থাপনা, মান নিয়ন্ত্রণ, শ্রমমান নিশ্চিতকরণ এবং ব্যবসাবান্ধব পরিবেশ তৈরিতে দ্রুত সংস্কার প্রয়োজন। একই সঙ্গে রপ্তানি বৈচিত্র্য বাড়ানো এবং নতুন পণ্যে জাপানি বাজার ধরার কৌশল গ্রহণ করতে হবে।