- রোববার ০১ ফেব্রুয়ারি ২০২৬

| মাঘ ১৯ ১৪৩২ -

Tokyo Bangla News || টোকিও বাংলা নিউজ

তারেকের ‘হ্যাঁ’ ভোটের ডাকে সরকারে স্বস্তি

আজকের পত্রিকা

প্রকাশিত: ১৪:৩৮, ১ ফেব্রুয়ারি ২০২৬

তারেকের ‘হ্যাঁ’ ভোটের ডাকে সরকারে স্বস্তি

  • সাময়িক ‘নীরবতার’ পর গণভোটে ‘হ্যাঁ’-এর পক্ষে স্পষ্ট অবস্থান
  • পরিকল্পিত রাজনৈতিক কৌশল হিসেবে দেখছেন পর্যবেক্ষকেরা
  • জুলাইয়ের তাৎপর্য বিবেচনায় নিয়েছেন দলের শীর্ষ নেতৃত্ব
  • বরাবরই বিএনপি ‘হ্যাঁ’ ভোটের পক্ষে ছিল, দাবি নেতাদের

নির্বাচনী প্রচারের শুরু থেকে গণভোট ইস্যুতে অনেকটা নীরব ছিল বিএনপি। অন্যান্য দলের পাশাপাশি জুলাই সনদে সই করলেও গণভোটে দলটির অবস্থান ভোটের প্রচারে পরিষ্কার করে বলা হচ্ছিল না। গণভোট ইস্যুতে বিএনপির এই আপাত-নীরবতা ঘিরে নানা মহলে প্রশ্ন ছিল। দলটির এই অবস্থানকে একপর্যায়ে ভোটের মাঠে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করা শুরু করে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ। এই বাস্তবতার মুখে অবশেষে বিষয়টিতে আনুষ্ঠানিকভাবে নীরবতা ভাঙল বিএনপি। বিএনপি অবস্থান স্পষ্ট করায় দৃশ্যত সরকারের মধ্যেও স্বস্তি এসেছে।

এ বিষয়ে প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী অধ্যাপক আলী রীয়াজ আজকের পত্রিকাকে বলেন, ‘নির্বাচনী প্রচারের শুরুতে রাজনৈতিক দলগুলো গণভোটের ব্যাপারে তাদের অবস্থান তুলে ধরবে, এমনটাই কথা ছিল। কিন্তু দেখা গেল, বিশেষত বিএনপি ও জামায়াতকে দলীয় মনোনয়ন ও আসন সমঝোতা নিয়ে বেশি সময় দিতে হয়েছে। এই প্রক্রিয়া শেষে দলগুলো প্রচার শুরু করেছে। জামায়াতে ইসলামী এবং অন্যান্য দল আগে থেকে (গণভোটের প্রচার) করছিল। বিএনপির প্রচারণায়ও আমরা দেখলাম যে দলের চেয়ারম্যান তারেক রহমান খুব সুস্পষ্টভাবে বলেছেন হ্যাঁ-এর পক্ষে ভোট দেওয়ার জন্য।’

দলীয় সূত্রগুলো বলছে, গণভোটের প্রশ্নে বিএনপির নীরবতা ভালোভাবে নিচ্ছিল না জুলাই সনদে স্বাক্ষরকারী অন্য রাজনৈতিক দলগুলো। হ্যাঁ ভোটের পক্ষে জোরেশোরে প্রচার চালানো অন্তর্বর্তী সরকারের মধ্যেও এ নিয়ে একধরনের অস্বস্তি ছিল।

গত শুক্রবার রাতে রংপুরের নির্বাচনী জনসভায় স্পষ্ট ভাষায় গণভোটে হ্যাঁ-এর পক্ষে ভোট দেওয়ার আহ্বান জানান বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান। তিনি জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে রংপুরের আবু সাঈদ, চট্টগ্রামের ওয়াসিমসহ হাজারো মানুষের আত্মত্যাগের কথা স্মরণ করে বলেন, ‘তাঁদের জীবন উৎসর্গকে মূল্যায়ন করতে হলে আমরা যে জুলাই সনদে স্বাক্ষর করেছি, সেই জুলাই সনদকেও আমাদের সম্মান করতে হবে। সে জন্যই আপনাদের সকলকে অনুরোধ করব যে ধানের শীষে যেমন সিলটা দেবেন ১২ তারিখে, একই সঙ্গে আপনাদের যে দ্বিতীয় ব্যালট পেপারটি দেবে “হ্যাঁ” এবং “না”, সেখানে হ্যাঁ-এর পক্ষে দয়া করে আপনারা রায় দেবেন।’

গণভোটে হ্যাঁ রায়ের পক্ষে বিএনপির চেয়ারম্যানের দ্ব্যর্থহীন এই বক্তব্যের পর হঠাৎ করে এই অবস্থান নেওয়ার কারণ নিয়ে নতুন আলোচনা শুরু হয়েছে। নির্বাচনী প্রচারের প্রথম সপ্তাহ কেটে যাওয়ার পর হ্যাঁ-এর পক্ষে বিএনপির অবস্থান তুলে ধরাকে রাজনৈতিক কৌশল হিসেবে দেখছেন পর্যবেক্ষকেরা। তাঁরা বলছেন, ৫ আগস্টের আলোড়ন তোলা রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের প্রেক্ষাপটে আগামী নির্বাচনে জুলাই ইস্যুটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এই নির্বাচনে ভোটারদের বড় অংশ তরুণ। তাঁদের অনেকে জীবনে প্রথম ভোট দিতে যাচ্ছেন। তাই ভোটের হিসাবসহ কৌশলগত বিভিন্ন বিষয় বিবেচনা করে কিছুটা সময় নিয়ে হলেও বিএনপি বিষয়টি স্পষ্ট করেছে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক আয়নুল ইসলাম আজকের পত্রিকাকে এ বিষয়ে বলেন, ‘বিষয়টা তো রাজনৈতিক। তাই সময় নিয়েছে বিষয়টা পরিষ্কার করতে। বিএনপি একটি বড় রাজনৈতিক দল। নিজেদের রাজনৈতিক কৌশলের অংশ হিসেবে তারা এটা স্পষ্ট করেছে...যেহেতু একটা কথা উঠেছে যে বিএনপি কেন তাদের অবস্থান পরিষ্কার করছে না। প্রতিপক্ষও যখন বারবার বিষয়টি সামনে আনছে, তখন দলের চেয়ারম্যান জনগণের সামনে বিষয়টি পরিষ্কার করেছেন।’

দলীয় সূত্রগুলো বলছে, গণভোটের প্রশ্নে বিএনপির নীরবতা ভালোভাবে নিচ্ছিল না জুলাই সনদে স্বাক্ষরকারী অন্য রাজনৈতিক দলগুলো। হ্যাঁ ভোটের পক্ষে জোরেশোরে প্রচার চালানো অন্তর্বর্তী সরকারের মধ্যেও এ নিয়ে একধরনের অস্বস্তি ছিল। বিএনপির কর্মী-সমর্থকসহ জনমনেও এ নিয়ে সংশয় বা বিভ্রান্তি সৃষ্টি হয়েছিল। নির্বাচনের দিন যত ঘনিয়ে আসছে, ততই প্রতিপক্ষ বেশি করে এই নীরবতাকে বিএনপির বিরুদ্ধে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করছিল। নির্বাচনী সভা, প্রচারপত্র থেকে শুরু করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম—সবখানেই ‘বিএনপি গণভোট নিয়ে দ্বিচারিতা করছে’—এমন বয়ান ছড়িয়ে দেওয়া হচ্ছিল। এতে নির্বাচনে দলটির ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়ার আশঙ্কা তৈরি হয় নীতিনির্ধারকদের মধ্যে। এ ক্ষেত্রে প্রশাসনজনিত একটি উদ্বেগও ছিল তাঁদের। সব মিলিয়ে গণভোট ইস্যুতে স্পষ্ট অবস্থান না নিলে রাজনৈতিক ও কৌশলগতভাবে ক্ষতির আশঙ্কাই বেশি—এমন মূল্যায়নে পৌঁছায় বিএনপি। তাই শেষ পর্যন্ত আনুষ্ঠানিকভাবে হ্যাঁ-এর পক্ষে ভোট দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন তারেক রহমান।

গণভোট নিয়ে বিএনপির জনসমক্ষে অবস্থান পরিষ্কার করার ঘোষণা আসার পেছনে অন্তর্বর্তী সরকারেরও চেষ্টা ছিল বলে জানিয়েছে একটি সূত্র। সূত্রটি বলছে, উত্তরবঙ্গ সফরের আগে গণভোটের বিষয়ে তারেক রহমানের সঙ্গে বৈঠক করেন সরকারের উচ্চপর্যায়ের দুজন ব্যক্তি। বৈঠকে সরকারের দায়িত্বশীল ব্যক্তিরা গণভোটে ‘হ্যাঁ’ এবং ‘না’—কোনটি জয়ী হলে কী হতে পারে, তা বিস্তারিতভাবে ব্যাখ্যা করেন তারেক রহমানের কাছে। বিএনপির নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের একজন নেতাও চেয়ারম্যানের সঙ্গে বিষয়টি নিয়ে বসেন। এর পরেই ঠিক হয়, উত্তরাঞ্চল সফরকালে রাজশাহীর জনসভায় বিএনপির পক্ষ থেকে হ্যাঁ-এর পক্ষে ভোট চাইবেন তারেক রহমান। তবে পরে রংপুরের জনসভায় এ ঘোষণা দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।

বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান শামসুজ্জামান দুদু অবশ্য হ্যাঁ-এর পক্ষ নেওয়ার সিদ্ধান্ত আগে থেকেই ছিল বলে দাবি করেছেন। গতকাল শনিবার আজকের পত্রিকাকে তিনি বলেন, ‘শুরু থেকে বিএনপির অবস্থান জুলাইয়ের গণ-অভ্যুত্থানের পক্ষে। বিএনপি আগে থেকেই হ্যাঁ-এর পক্ষে ছিল, যদিও তা সেভাবে প্রচারে আসেনি। দলীয় প্রধান নিজে কোনো বিষয়ে কথা বললে সেটা বেশি হাইলাইট হয়। অন্যান্য নেতা যখন বলেন, সেটা ওইভাবে হয় না। এ ক্ষেত্রে তাই-ই হয়েছে।’

বিষয়টি নিয়ে প্রতিপক্ষের প্রচারণা ও সমালোচনা প্রসঙ্গে দুদু বলেন, ‘ফলভরা গাছে ঢিল পড়ে বেশি। বিএনপি ফলভরা গাছ। অন্য দলগুলোকে ফলভরা গাছ বলা যাবে না। সে কারণে বিএনপিকে বেশি ধৈর্য ধারণ করতে হবে এবং বেশি সহ্য করতে হবে। গণতন্ত্রের প্রধান শক্তি হচ্ছে বিএনপি। সহনশীলতার সঙ্গেই বিএনপি এগিয়ে যাচ্ছে।’

এ বিষয়ে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য সেলিমা রহমানও আজকের পত্রিকাকে কয়েক দিন আগে বলেছিলেন, ‘হ্যাঁ ভোটের বিষয়ে আমরা তো অঙ্গীকারবদ্ধ।’

বিএনপির নির্বাচনী প্রচারের দায়িত্বে থাকা একাধিক ব্যক্তি তখন আজকের পত্রিকাকে বলেছিলেন, গণভোটের প্রচার নিয়ে দলের পক্ষ থেকে তেমন সরাসরি নির্দেশনা নেই। এখন দলীয় মার্কার পক্ষেই প্রচারকে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। তবে গণভোট নিয়ে প্রচার করলে হ্যাঁ ভোটের পক্ষে করা হবে।